![]() |
| Image source: Reuters |
একেবারে বসবাসের অযোগ্য জায়গা থেকে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ আয়োজন করছে "দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ" বিশ্বকাপ। আপনার মনে নিশ্চই প্রশ্ন জাগে কিভাবে পারলো কাতার এত বড় আয়োজন কে বাস্তবায়ন রূপ দিতে। আপনার মনে এটাই প্রশ্ন জাগে এত টাকা ব্যয়ে করে কাতার এর থেকে কতটা প্রাপ্তি অর্জন করবে।
একেবারে দরজার দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। চলুন একটু জানার চেষ্টা করি হতদরিদ্র দেশ থেকে উঠে আসা কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতারের সামর্থ্যের গল্প। আর সেইসাথে মধ্যপ্রাচ্যেই এই দেশটাতে বিশ্বকাপের ভূমিকা কেমন।
মরুভূমির দেশ কাতার ৫০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার একটি দেশ। এমন তীব্র তাপমাত্রার সাথে দেশটি ছিল চরম দরিদ্র। ১৯৭১ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর দেশটির সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহ শুরু হয় মাছ ধরা ও মুক্তা স্বীকার করে। ভাগ্য ফেরে তেল আর গ্যাসের খনির মাধ্যমে। ১৯৪০ সালে তেল আর ১৯৭০ সালে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্যাসের খনি আবিষ্কৃত হয় কাতারে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ ছিল সঠিকভাবে এই খনির ব্যবহার করা।
১৯৯৫ সালে কাতারের আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানি তার বাবাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজে ক্ষমতা নেয়ার পরে নিয়ে আসেন সমাধান। প্রাকৃতিক গ্যাস কে তরলে পরিণত করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ার প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় তখন থেকে। তাতে যত পরিমাণ পোর্ট ও যত পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করার দরকার থানি তার সবটুকুই করেন। এরপর ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় লিকুইড ফাইন্যান্সিয়াল গ্যাস এলএনজির রপ্তানিকারক দেশ হয়ে ওঠেন কাতার। এই বাণিজ্য কে কেন্দ্র করে আস্তে আস্তে গড়ে ওঠে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স। এখানে উত্তোলিত গ্যাস তরলী করণ খরচ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম হয়। এরপর থেকে কাতারকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি। এবং হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ।
এভাবে উত্থান আর সেখান থেকে ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপের হোস্ট কান্ট্রি। আমরা কাতারের স্টেডিয়াম এর গল্প শুনেছি। আটটি স্টেডিয়ামের পাশাপাশি বিশ্বকাপ আয়োজন করতে কাতার তৈরি করেছেন উন্নতমানের হোটেল, হসপিটাল, শপিংমল এবং অত্যাধুনিক এয়ারপোর্ট। একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২২ বিশ্বকাপের জন্য কাতারে ব্যয় করেছে ২২৯ বিলিয়ন ইউএস ডলার। যা ১৯৯০ থেকে ২০১৮ বিশ্বকাপ পর্যন্ত টোটাল খরচের পাঁচগুণ বেশি টাকা খরচ করেছে কাতার।
এত টাকা খরচ করা কাতারের এখান থেকেই লাভ কি। আমরা অনেকেই মনে করি হোস্ট কান্ট্রি গুলো এখান থেকে প্রচুর অর্থ আয় করে থাকে কিন্তু আসলে টাকার বেনিফিটের লিস্টে হোস্টের চেয়ে এগিয়ে থাকে ফিফা।
চলুন এবার দেখি বিশ্বকাপ থেকে টাকা তোলার যে খাত গুলো রয়েছে সেগুলো কি কি। যেমন হসপিটালিটি একোমোডেশন, টিকিট বিক্রি, এগুলোর মধ্যে হসপিটালিটি একোমোডেশন থেকে হোস্ট কান্ট্রি আয় হয় শতভাগ। কিন্তু টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ গুলো পায় ফিফা।
এবারের বিশ্বকাপে টিকিট বিক্রি হয়েছে ৩ মিলিয়ন।
ব্রডকাস্ট ও আইস মিডিয়ার কথা যদি বলি এটা ফিফার আয়ের অন্যতম মাধ্যম। আমরা যদি ২০১৮ বিশ্বকাপের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে সেই আসর থেকে ফিফার মোট আয়ের ৫৫ ভাগই এসেছিল এই আইস মিডিয়ার মাধ্যম থেকে। আয়ের সংখ্যাটি ছিল ৪.৬ বিলিয়ন ডলার।
এরপর রয়েছে স্পন্সরশীপ, মার্কেটিং,লাইসেন্সিং রাইডস এই ক্যাটাগরি গুলো থেকে ফিফার আয়ের অন্যতম উৎস। এখানে ও কাতারের কোন আয় নেই। তবে কাতারের আয়ের বড় মাধ্যম যেটা হতে পারে সেটা হলো ট্যুরিজম। যেটা অন্যান্য সময় হোস্ট কান্ট্রি গুলোর আয়ের অন্যতম একটা বড় মাধ্যম হয়। যদিও অনেক সময় নেগেটিভ ট্যুরিজমের শিকার হতে হয় যেমন, ট্র্যাফিক জ্যাম,নয়েজ,বা অতিরিক্ত দাম অনেক কিছু। প্রভাব পড়ে এই খাতে ।
কিন্তু এ সবকিছুকে ছাড়িয়ে কাতারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে এর অতিরিক্ত তাপমাত্রা। সবকিছু মিলিয়ে কাতারকে ভোগান্তিতে ফেলতে পারে ট্যুরিজম। তারপরও তারা আশাবাদী বিশ্বকাপ মৌসুমে এই সেক্টর থেকে ১.২ বিলিয়ন ভিজিটরস। ভিজিটরদের দ্বারা ট্যাক্স এর মাধ্যমে হোস্ট কান্ট্রির ইনকাম হয়ে থাকে। হোস্ট কান্ট্রির সবচেয়ে বড় যে প্রাপ্তি বিশ্বকাপ থেকে মূলত সেটা হলো সেদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। যেমন রাস্তা তৈরি করা হয় পাবলিক ট্রান্সপোর্টৈশন অথরিটি তৈরি হয়। এবং হোস্ট সিটি ও নানান ভাবে সংস্কার করা হয়।
আমরা যদি রাশিয়ার দিকে একটু দেখি ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের সময় দেশটিতে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজারের মতো চাকরির সুযোগ সুবিধা তৈরি হয়। যা আগামী পাঁচ বছর দেশটিতে ইকোনমিক সেক্টরে ভালোভাবে প্রভাব ফেলে।
২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মানে গারিঞ্চা স্টেডিয়ামেকে আমরা দেখতে পাই যা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে একটি বাস ডিপো হিসেবে। কাতার স্টেডিয়াম গুলো সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় অনেক স্টেডিয়াম বিশ্বকাপের পরে তাদের আর লাগবে না পরে সেগুলো তারা কোনো অনুন্নত দেশে দিয়ে দেবে বলেছে যেখানে দেশের ফুটবল উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
তবে দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নে কাতার আলোকপাত করেছে। কারণ এতে হোস্ট কান্ট্রি গুলোর মধ্যে একটা socio-economic প্রজেক্ট ইন্সপেক্ট পড়ে। এই ওয়ার্ল্ড কাপের মাধ্যমে কাতার বিশ্বব্যাপী যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ এমন একটি ইভেন্ট যার মাধ্যমে কাতার পুরো বিশ্বে পরিচিতি পাবে। বাইরে থেকে কাতারের অনেক বিনিয়োগ বাড়বে। সুতরাং, কাতারের জন্য এটা একটা ইনভেস্টমেন্ট প্রসেস। কাতারকে এর আগেও অনেকবার সফল ভাবে এশিয়ান গেমস, সহ বিভিন্ন স্পোর্টিং ইভেন্ট আয়োজন করতে দেখা গেছে। ফিফা বিশ্বকাপ তেমনি একটি ইভেন্ট যার মাধ্যমে কাতার প্রডাকশন, ইনকাম, এক্সপেন্স সবক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য সম্ভব করতে চাচ্ছেন। যেটা দ্বারা দেশটির প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তো রয়েছে। তার পাশাপাশি বিশ্বকাপ থেকে আশা করছে ১৭ বিলিয়ন ডলার আয় করার। আলোচনা-সমালোচনা সব হিসেব নিকেশের পরে আপাতত সবাই চিন্তায় সুষ্ঠু সুন্দর ভাবে মধ্যপ্রাচ্যের এ আয়োজনকে সফল করার।

0 মন্তব্যসমূহ