Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

পশুর পাকস্থলী দিয়ে বানানো ফুটবল থেকে আধুনিক ফুটবলের বিবর্তন

বিশ্বকাপ ফুটবল প্রথম মাঠে গড়িয়েছে ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে। সেই বিশ্বকাপ এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মরুভূমির দেশ কাতারে। গত প্রায় এক শতকে বিশ্বকাপ পেয়েছে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের তকমা। বল গড়িয়েছে অনেক দূর। চামড়ার তৈরি বিবর্ণ ফুটবল গুলো বহু বিবর্তনের ফলে পেয়েছে রং,ছন্দ ও গতি। ১৯ শতকের বরাতে ফুটবল খেলা পরিচালনা করা হতো বিশেষ কোন প্রাণীর পাকস্থলী দিয়ে বানানো বল দিয়ে।

প্রাণীর পাকস্থলী দিয়ে বানানো বিশেষ বল; Image Source: Twitter 

তার পর থেকে বেহাল এই ফুটবলের প্রথম পরিবর্তন আসে চার্লস গুডইয়ারের হাত ধরে। ১৯৫৫ সালে রাবারের ব্লাডারের উপর চামডার আস্তরণ লাগিয়ে তৈরি করা হতো ফুটবল।

১৯৩০ সালে ফুটবল বিশ্বকাপের সূচনা হয় এমন বল দিয়ে। তখন ফুটবল খেলার জন্য অফিশিয়াল ভাবে কোন বলের ব্যবস্থা ছিল না।নিজ নিজ দেশের তৈরি বল দিয়ে ফুটবল খেলতেন তাঁরা। ফাইনালে পৌঁছে আর্জেন্টিনা উরুগুয়ে তারা দু দলে নিজেদের তৈরি বল দিয়ে খেলতে চাইলে প্রথম অর্ধে আর্জেন্টিনার বল টিইনটি দিয়ে পরের শেষ অর্ধের খেলা শেষ করা হয় উরুগুয়ের টি-মডেলের বল দিয়ে।

১৯৩০ বিশ্বকাপের জন্য বানানো উরুগুয়ের টি মডেলে বল; Image Source: Pinterest 

বলের আকার ও ওজন খেলার যে প্রভাব ফেলতে পারে তা বুঝা যায় এই খেলা থেকে। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে থাকলেও শেষ অর্ধের খেলায় উরুগুয়ে তাদের অপেক্ষাকৃত বড় ও ভারী টি-মডেলের বল দিয়ে গোল করে ৪-২ গোলের ব্যবধানে জিতে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দীর্ঘ ১২ বছর বিরতির পর পঞ্চাশের দশকে নতুন করে ফুটবল বিশ্বকাপে লাগে প্রযুক্তির ছোঁয়া। ব্রাজিল বিশ্বকাপে ব্যবহৃত সুপার বল ডুপলো-টি বলটি ছিল আগের বল গুলোর তুলনায় গোলাকার।

১৯৭০ সালে মেক্সিকোর বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হয় আডিডাসের যুগ।

সাদা কালো পেন্টাগন ও হেক্সাগনের সমন্বয়ে তৈরি করা টেলাস্টার ফুটবল; Image Source: FIFA 

১২ টি পেন্টাগন এবং ২০ টি হেক্সাগন আইকনের সাদা কালো টেলস্টার প্রবর্তনের মাধ্যমে সূচনা হয় এডিডাস অধ্যায়ের।

১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ ছিল টেলিভিশন সরাসরি প্রচারিত প্রথম বিশ্বকাপ। টেলস্টারের সাদা কালো কম্বিনেশন তখন খুব ভালো ভাবে ফুঠে ওঠেছে টিভির পর্দায়। যে টেলস্টার স্যাটেলাইটের মাধ্যমে নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল সেই স্যাটেলাইটের আদলে এবং একি নাম অনুসারে এই বলটির নাম রাখা হয়েছে টেলস্টার। ক্লাসিক টেলস্টারের নকশা ধরে রাখা হয় পরের বিশ্বকাপে। পশ্চিম জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে ব্যবহৃত বলটির নাম ছিল টেলস্টার ডারলাস্ট।

জার্মান বিশ্বকাপে ব্যবহৃত টেলস্টার ডারলাস্ট; Image Source: Twitter 

টেলস্টার মতো নকশা হলে ডারলাস্টের চামড়ার প্যানেলের উপর পাতলা পলিইউরেথেনের আবরণ ব্যবহার করা হয়।

১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের বলটির নাম ছিল আডিডাস ট্যাঙ্গো। ট্যাঙ্গো এতোটাই জনপ্রিয় ছিল যে ১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপ তো বটেই ১৯৮৮ সালের ইউরোপীয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ এবং সেই বছর অলিম্পিক এই বল দিয়ে খেলা হয়।

স্পেন বিশ্বকাপে ব্যবহৃত বল ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া

স্পেন বিশ্বকাপ ব্যবহৃত বলটির নাম ছিল ট্যাঙ্গো এস্পানিয়া। এটাই ছিল বিশ্বকাপে ব্যবহার করা সর্বশেষে ও সম্পূর্ণ চামড়ার বল।

আরো পড়ুন;

ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা প্লেয়ার


এক ছবির খরচ ৮৪ কোটি টাকা


২০২২ কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফা কিভাবে কত টাকা আয় করবে| Qatar World Cup 2022


আডিডাস সিদ্ধান্ত নেয় ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপের জন্য নতুন একটি বল ব্যবহারের যার নাম রাখা হয় আজটেকা।

১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের জন্য নকশা করা আজটেকা ফুটবল; Image Source: Twitter 

হাতে সেলাই করা ৩২ ডিজাইন প্যানেলের সাথে ট্যাঙ্গোর সাথে মিল থাকলেও আজটেকা শতভাগ কৃত্রিম উপকরণ দিয়ে তৈরি। প্রথমবার মতো বলের গায়ে ফুটে ওঠে স্বাগতিক দেশের নকশা। ১৯৯০ সালে ইতালি বিশ্বকাপের বল ছিল আজটেকার মতো এয়ারভিস্কো ইউনেস্কো প্রথম বিশ্বকাপ বল যেটার বাইরের সেলের নিচে কালো পলিইউরেথেনের ফোমের একটি স্তর লাগানো যা ছিল একেবারেই দারুন ওয়াটার প্রুফ।

১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বকাপে আডিডাসের কোয়েস্ট্রা ছিল প্রথম বিশ্বকাপ বল যা পুরো টাই ছিল পলিইউরেথেনের ফোমে মোড়ানো।

আডিডাসের কোয়েস্ট্রা ফুটবল যা ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করা হয়েছিল; Image Source: Pinterest 


যার ফলে বলের গতি বেড়ে গিয়েছে আরো।কোয়েস্ট্রা গায়ের বিবরণে ফুটে উঠেছে মহাকাশে আমেরিকার বিস্ময়কর সাফল্য গাঁথা।


১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের হাত ধরে আসে বহু বর্ণের বল ট্রিকালার। যার কালার ফরাসি বিপ্লবের সময় ব্যবহৃত সাদা, নীল, এরপর ফ্রান্সের চিরাচরিত প্রতিক মুরগের চিত্র ফুটে উঠেছিল। ট্রিকালার ছিল বিশ্বকাপের শেষ বল। ২০০২ সালে জাপান ও কোরিয়া বিশ্বকাপে ফেভারনোভা বলটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তিতে তৈরি এবং বিজ্ঞান নির্ভর তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন টি আসে ২০০৬ সালে জার্মানি বিশ্বকাপে সেখানে আডিডাস নিয়ে আসে টিমগাইস্ট বল। জার্মানিতে আডিডাস গবেষণা গারে তিন বছর ধরে গবেষণা করে এই বল তৈরি করা হয়। ৩২ টি ছোট প্লেটের বদলে এর পৃষ্টে ছিল ১৪ টি প্লেট যা খেলোয়াড়দের সাহায্য করেছিল যেন বলটি আরো কন্ট্রোলে নিয়ে আসতে এই সময় প্লেট গুলো সেলাই না করে আটা দিয়ে জুড়ে দেয়া হয়।

সেই প্রথম বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের জন্য নির্দিষ্ট একটি করে বল বরাদ্দ করা হয়েছিল।বলের গায়ে লেখা হয়েছিল ম্যাচের তারিখ,দল,স্টেডিয়ামের নাম ও সর্বশেষ ম্যাচ শুরু হওয়ার সময়।

২০২০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ খেলা হয় আডিডাসের জাবুলানি বল দিয়ে; Image Source: Getty images 

২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে আসে জাবুলানি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত বল ছিল এটি। এর মুভমেন্ট ও গতি যথেষ্ট ভুগিয়েছেন প্লেয়ারদের সেই ভোগান্তি দূর করতে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আসে ব্রাজুকা। ৬ টি পলিইউরেথেনের প্লেটের আবরণে এই বলে খেলা যথেষ্ট উপভোগ্য ছিল। প্রথমবারের মতো বলে লাগানো হয় গোল লাইন সেন্সর।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে টেলস্টার কে ফিরিয়ে আনা হয় নতুন রূপে। ১৯৭০ সালে ব্যবহৃত আডিডাসের নাম ও নকশার উপর ভিত্তি করে এই বলটি তৈরি করা হয়।

সর্বশেষ কাতার ফিফা বিশ্বকাপ খেলা হচ্ছে আল রিহলা ফুটবল দিয়ে; Image Source: FIFA 

আর এবার কাতার বিশ্বকাপে খেলা হচ্ছে বিশ্ব ইতিহাসের প্রথম হাইটেক বল আল রিহলা দিয়ে। অনেক নতুনে মোড়া মধ্যে প্রাচ্যের প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবল ও বেশ নজর কেড়েছে। আল রিহলার মাঝে ফুটে উঠেছে সাগরের বিখ্যাত নৌকার পাল কাতারের স্থাপত্য শিল্প এবং জাতীয় পতাকা। ৪২০ গ্ৰাম ওজনের এই বলটি ভেতরে লাগানো আছে সেন্সর। এই বলটি সহজে ধরিয়ে দিবে অফসাইড। জানিয়ে দেবে সঠিক ফ্রি কিক। আরবি ভাষা আল রিহলা শব্দের অর্থ দ্য জার্নি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ