নিউরালিংক এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে যা মেশিনের সাথে মানুষের যোগাযোগের ধরন সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দিবে। মেশিন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাঁরা শুধু মানুষের মস্তিষ্ক বা ব্রেন কে ব্যবহার করতে চায়। এই কোম্পানির প্রথম লক্ষ্য হলো ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস তৈরি করা। যা মানুষের মস্তিষ্কের একটি কম্পিউটার সংস্করণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই কাজ টি করার জন্য নিউরালিংক একটি ডিভাইস তৈরি করেছে যা সরাসরি মানুষের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রতিস্থাপনের কাজটি যেন সহজ হয় সেই জন্য ব্যাথা মুক্ত সার্জারি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা হয়েছে।
মস্তিষ্কের অতি সামান্য জায়গা দখল করার জন্য কয়েক ধাপে এই ডিভাইসের নকশাতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই ডিভাইসটির আঁকার অনেকটা কয়েনের সমান। এর ভেতর এতো পাতলা বিদ্যুৎ পরিবাহী ইলেকট্রন বসানো হয়েছে যা মানুষের চুলের ২০ ভাগের এক ভাগ মাত্র।
এই ডিভাইসটি বসানোর জন্য মাথার খুলির সামান্য কিছু অংশ খুলে ফেলতে হয় এরপর সেই ছিদ্র পথে নিউরালিংক ডিভাইসটি মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিখুঁত ও যথাযথ ভাবে সম্পন্ন করার জন্য নিউরালিংক বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ ধরনের রোবট তৈরি করেছে। এই রোবটের সাহায্যে মানুষের এই জটিল অপারেশনের কাজটি সম্পন্ন করবে।
মস্তিষ্কে চিপ টি প্রতিস্থাপন করার আগে ব্যাক্তিকে আংশিক এনেস্থিসিয়া প্রদান করা হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ১ ঘন্টার ও কম সময় লাগবে। এবং অপারেশন শেষে মাথায় একটু সামান্য দাগ থাকতে পারে। মস্তিষ্কে নিউরালিংক ডিভাইস বসানোর পর থেকে এই যন্ত্র ব্রেন সিগনাল নিয়ে কাজ শুরু করবে। একি সাথে ডিভাইসটি সিগন্যাল সেন্ড ও রিসিভ করতে পারবে। মস্তিষ্কের সিগন্যাল নিয়ন্ত্রন নেয়ার মাধ্যমে নিউরালিংক বিভিন্ন মেশিনের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। প্রথম দিকে ডিভাইসটি সক্রিয়ভাবে চালু হওয়ার সাথে সাথে এর সাহায্যে কম্পিউটারের মতো বেসিক ডিভাইস গুলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
আমাদের ব্রেন থেকে সমস্ত শরীরে নানা ধরনের নির্দেশনা পাঠানো হয়। আর এই কাজটি করে মস্তিষ্কের নিউরন। আর এই নিউরন গুলো একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে। ব্রেনে থাকা নিউরোট্রান্সমিটার নামে এক ধরনের রাসায়নিকের সাহায্য যোগাযোগের সিগন্যাল গুলো কাজ করে। এই নিউরোট্রান্সমিটার রিয়েকশন এক ধরনের ইলেকট্রিক ফিল্ড তৈরি করে। এই ইলেকট্রিক ফিল্ডের কাছাকাছি ইলেকট্রন তৈরি করে মস্তিষ্কের রিয়েকশন রেকর্ড করা সম্ভব। নিউরালিংকে চিপ মানুষের মাথার ভেতর ঠিক সেই কাজটি করবে। এই চিপের ইলেকট্রন মস্তিষ্কের রিয়েকশন গুলো কে রেকর্ড করে এমন অ্যালগরিদমে রূপান্তর করতে পারে যা সহজে কম্পিউটারের সাহায্যে পাঠ করা যায়।
নিউরালিংক ডিভাইস ইতিমধ্যে বেশ কিছু শকুর ও বানরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।
আরো পড়ুন;
•জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা নোকিয়া সেল ফোনের একাল সেকাল| Nokia cell phone
•কিভাবে সফল আজকের মাইক্রোসফট| Microsoft
এই ডিভাইস কিভাবে কাজ করে সেটা আরো ভালো ভাবে জানার জন্য "মানকি মাইন্ড পঙ্গ" নামে একটি পরিক্ষার বিষয়ে আলোচনা করা জরুরি।
Image Source: Youtube
একটি বানরের মস্তিষ্কের দুই পাশে এই ডিভাইস বসিয়ে পরীক্ষা টি করা হয়। বানরের মস্তিষ্কে থাকা নিউরালিংক চালু করতে আমাদের মোবাইলের সাহায্যে যেভাবে ব্লুটুথ স্পীকার কানেক্ট করা থাকে ঠিক সেভাবেই স্মার্ট ফোনের একটি এপস চালু করে বানরের মস্তিষ্ক কম্পিউটারের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এরপর বানরটির হাতে একটি জয়স্টিক দিয়ে এবং তার সামনের স্ক্রীনে কমলা রঙের একটি টার্গেট দেওয়া হয়। বানর টি প্রতিবার টার্গেট টি হিট করতে পারলে একটি পাইপের সাহায্যে তাকে বেনেনা জুস দেয়া হয়। ফলে জুসের আশায় সেই বারবার টার্গেট টি হিট করতে থাকে।
বানরটি যখন এই খেলায় ব্যস্ত তখন তার মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যক্রম একটি কম্পিউটারের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বানরের মস্তিষ্কের কার্যক্রম ও তার জয় স্টিক নাড়ানোর ধরণ পর্যবেক্ষণ করে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করা হয়েছে। যার সাহায্যে বানরটি সরাসরি ব্রেন দিয়ে টার্গেটে হিট করতে পারে। বানরটি এখনো তার অভ্যাস অনুযায়ী জয়স্টিক টি নাড়াচাড়া করছে।
বানর টিকে কিছুক্ষণ এই ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর সম্পূর্ণ জয় স্টিক খুলে ফেলে বানরটির সামনে একটি ভিডিও গেম চালু করে দেওয়া হয়। এবার তার হাতের নাড়াচাড়া ছাড়াই গেম টি খেলতে পারছে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও নিউরালিংক ডিভাইস ধারা মস্তিষ্কের সিগন্যাল রেকর্ডিং ও ডিকোডিংয়ের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াটি সম্ভব হয়েছে। এটি যেন সত্যিকারের মগজ ধোলাই যন্ত্র।
এর আগে একটি শকুরের মাথায় নিউরালিংক বসিয়ে কম্পিউটারের সাহায্যে দূর থেকে তার পা নাড়াচাড়া করা হয়েছে। নিউরালিংক মানুষের উপযোগী হওয়ার পর হয়তো এই প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের মগজ ও চিন্তায় করা যাবে।
![]() |
| Image Source: Youtube |
ইলন মাস্কের দাবি নিউরালিংক ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের স্মার্ট ডিভাইস কম্পিউটার,রোবট, এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রন করা যাবে। তবে নিউরালিংকের দাবি এই যন্ত্রটি মানব কল্যাণে তারা বেশি প্রাধান্য দেবে। বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগে চিকিৎসায় এমনকি কোন রোগ নিরাময়ে নিউরালিংক ব্যবহার করা যাবে। যেমন প্যারালাইসিস চিকিৎসা, থেকে শুরু করে মানসিক ও বিষন্নতার মতো জটিল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হবে। অতঃপর দৃষ্টি হীন ব্যাক্তিদের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কাজ করবে নিউরালিংক।
এমনকি ইলন মাস্ক দাবি করেন জম্মান্ধ ব্যাক্তি এই নিউরালিংক ডিভাইসের সাহায্য দেখতে পারবে। এছাড়াও এই ডিভাইস টির সাহায্য মানুষের শ্রবণশক্তি ও বৃদ্ধি করা যাবে। সাধারণত মানুষ যতদূর পর্যন্ত কানে শুনে নিউরালিংক দিয়ে তার চেয়েও বেশি দূরের শব্দ শুনা যাবে।



0 মন্তব্যসমূহ