![]() |
| মিশরের রাজধানী কায়রোতে অবস্থিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ; Image Source: Pixabay |
মিশরের রাজধানী কায়রো। আড়াইহাজার বছর ধরে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ শহর গুলোর মধ্যে একটি। পুরনো একটি মসজিদের মধ্যে দিয়ে কায়রোর যাত্রা শুরু হলেও এটি একটি এখন আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে পড়াশোনা করেন বাংলাদেশি সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্র ছাত্রীরা।
নীল নদের দেশ মিশর। নীল অববাহিকায় চারপাশে কায়রোর বিরল স্থাপত্য দ্বিধায় ফেলে দেয় কোনটা রেখে কোনটা দেখি। মিশরের শত বছরের পুরনো দেয়াল গুলো দেখলে বুঝতে পারবেন এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
আধুনিক শহর কায়রোর বয়স অবশ্য সেই তুলনায় বেশি নয়। ১৩০০ বছর আগে নবম শতাব্দীতে খলিফা আল মুইজ এই শহরকে রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন করে নামকরণ করেন 'কাহিরাত আল-মুইজ'। মূলত এখান থেকেই কায়রো নামের উৎপত্তি। এই খলিফার সময়ে জ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাওয়া শুরু করে কায়রো শহর। এবং প্রতিষ্ঠিত হয় আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।
খলিফা আল-মুইজ কে বলা হয় আমাদের নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) একমাত্র কন্যা বিবি ফাতেমার বংশধর। আর বিবি ফাতেমার আরেক নাম 'আল-জাহরা'। যার অর্থ দ্বীপ্ত বা আলোকজ্জ্বল। তার নামের প্রতি সম্মান রেখে পূর্ণ নামকরণ করা হয় পৃথিবীর অন্যতম শত বছরের পুরনো আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।
আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন মূলত ধর্ম তত্ব দিয়ে শুরু হয়। এখানে শুরু থেকে ফিকাহ, তাফসির, হাদিস দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে জ্ঞান অর্জন করার জন্য আসা শুরু করলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটাকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় কিভাবে রূপান্তর করা যায় সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করলেন। এভাবে সম্প্রসারণ হতে হতে আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পর্যন্ত ৬২ টি ফ্যাকাল্টি আছে।
কায়রো সহ বিভিন্ন শহরে আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো প্রায় ৫ টি ক্যাম্পাস রয়েছে। এবং ৫ লক্ষাধিক ছাত্র-ছাত্রী এখানে প্রতিনিয়ত অধ্যায়ন করে যাচ্ছেন। ১ হাজারের বেশি বাংলাদেশ থেকে আসা ছাত্র এখানে নিয়মিত জ্ঞান অর্জন করে চলছেন। এবং বাংলাদেশ সহ বিশ্বের আরো বিভিন্ন দেশ থেকে ১ লাখের উপরে ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে পড়াশোনা করতে আসেন।
মূলত এখানে হানাফি, শাফিঈ, মালিকি,হাম্বলি চার মাযহাবের উপর পাঠদান করা হয়। আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কনসেপ্ট টা হলো মধ্যে পন্থা অবলম্বন করা। আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একজন ছাত্র যে বিষয় নিয়ে পড়তে চাই তাকে অবশ্যই কোন একজন মাযহাবের অনুসারী হতে হবে। কারণ মাযহাবের বাইরে গিয়ে তাঁরা এটাকে সমর্থন করে না। তাঁরা এই ধারণা লালন করে যে কোরআন সুন্নাহ আমাদের ইমাম গণ যেভাবে বুঝিয়েছেন এর বাইরে গিয়ে নতুন করে যেন নিজস্ব কোন মতবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়। সেই কারণে আজহার বিশ্ববিদ্যালয় চার মাযহাব কে সুন্দর ভাবে লালন করে। এবং চার মাযহাবের উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পড়ানো হয়।
আধুনিক ক্যাম্পাস ঘুরা শেষে এবার চলে গেলাম সেই মসজিদের দিকে যেটি আজ থেকে ১০৫০ বছর আগে শুরু হয়েছিল খলিফা আল-মুইজের আমলে। কায়রোর পুরনো শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক সুসজ্জিত আল আজহার মসজিদটি। বলা হয় এখান থেকে ৯৭০ খিস্টাব্দে আল আজহার ইউনিভার্সিটির যাত্রা শুরু হয়। যেটা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত এবং মুসলিম বিশ্বের খুবই জনপ্রিয় ও মর্যদা পূর্ণ একটি বিদ্যাপীঠ।
অপূর্ব এই স্থাপত্যটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ৯৭২ খিস্টাব্দে এবং আনুষ্ঠানিক পাঠদান শুরু হয় ৯৭৫ খিস্টাব্দে।
পরবর্তীতে মসজিদের কিছু অংশ বাড়ানো হয় এবং পূর্ণ নির্মাণ করা হয়। এখন মসজিদের একটি অংশে নামাজ আদায় করা হয়। এখানে রয়েছে অনেকগুলো জ্ঞান বিতরণ কেন্দ্র ও পাঠাগার। এখানে চাইলে যে কেউ বিনামূল্যে পড়াশোনা করতে পারেন। নামাজ আদায় করার পরপরে এখানে অনেকগুলো কার্যক্রম চালু রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেটা বলা চলে সেটা হলো এখানে একটি ফতোয়া বোর্ড আছে যেখানে সার্বক্ষণিক মুফতী সাহেবরা বসে থাকেন এবং কোন ব্যক্তি জটিল কোন বিষয়ের মুখোমুখি হলে তাঁরা এখানে ছুটে আসেন।
ইতিহাস বরাবরের মতো আমাদের আলোডিত ও আবির্ভুত করে। কেননা মিশর এমন একটি দেশ যেখানে ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
এবার আসি আল-হুসাইন মসজিদ বা জামে সাইয়্যেদনা হুসাইন। আল আজহার মসজিদ থেকে বের হয়ে রাস্তার পাশ ধরে অল্প হাঁটলেই দেখা মেলে এই মসজিদটি। মিশরে শিয়া সম্প্রদায় মানুষ সংখ্যালঘু হলেও এই মসজিদটির কদর রয়েছে অনেক। ইরাকের কারবালায় ১১৫৩ সালে ইমাম হুসাইন কে শিরচ্ছেদ করার পর তাঁরা মস্তক কায়রোতে পাঠিয়ে দেয়া হয় সংরক্ষণের জন্য।
জানা যায়, সেই মস্তক মোবারক এখানে দাফন করে ১১৫৪ সালে একটি মাজার তৈরি করা হয়। পরে মসজিদটি নতুন করে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হয়। এবং প্রতিবছর এখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন।
আল হুসাইন মসজিদ থেকে বের হলে চোখে পড়বে ঐতিহাসিক খান এল-খালিলি বাজার। ১৩০০-১৬০০ শতাব্দীর মামলূকদের শাসনামলে এটি বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলত খলিফা আল-মুইজ বা তার ফাতেমী উত্তারধীকারিদের শাসনামলে এখানে প্রাসাদ ও প্রাসাদ চত্তর নির্মিত হয়। তার একটি অংশে গড়ে ওঠে এই বাজার। দূর দূরান্ত থেকে আসা প্রতীক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এক সময় যেটা আহার ও বিশ্রামের ব্যবস্থা ছিল সেখানে আজ পর্যটকের ভিড়।
আধুনিক কফি শপ থেকে শুরু করে আরবীয় জনপ্রিয় খাবার রুটির ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। আরো রয়েছে পর্যটকদের সংগ্ৰহের জন্য নানান রকমের উপহার পণ্য।

0 تعليقات