| টানা তিনবার বিশ্বকাপ জেতা কালো মানিক খ্যাত কিংবদন্তি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা পেলে; Image Source: Instagram |
আপনাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে পেলে না ম্যারাডোনা মেসি নাকি রোনালদো এসব বিতর্কের শুরু আছে তবে শেষ নেই। যদি প্রশ্ন করা হয় ফুটবলের সম্রাট কে তাহলে এক বাক্যে বলা যাবে তিনি আর কেউ নন কালো মানিক খ্যাত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার পেলে। ব্রাজিল দলের হয়ে যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন বিশ্ব ফুটবলে তা এককথায় অতুলনীয়। অন্যদিকে ম্যারাডোনা কে বলা হয় ফুটবলের রাজপুত্র আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি যে ফুটবল বিশ্বে শৈলী দেখিয়েছেন অনেকের মতে সেটা এক ধরনের শিল্প।
প্রখ্যাত লেখক সুনীল গাঙ্গুলী__ তার একটি লেখায় বলেছিলেন ম্যারাডোনার খেলা না দেখলে তার জানাই হতো না যে ফুটবল খেলা একটা শিল্প হতে পারে। দু জন কিংবদন্তির গায়ে সেরার তকমা থাকলেও পেলেকে ফুটবল জগতের শৃঙ্খলা প্রতীক আর ম্যারাডোনাকে উশৃঙ্খলা প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। একজন নিজেকে সারা জীবনের শৃঙ্খলার আবর্তে জড়িয়ে রেখেছেন আর অন্য জন হয়েছেন নানান কেলেঙ্কারির সাক্ষী।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে হাঁটুর ইনজুরি নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন SANTOS FOOTBALL ক্লাবের খুদে স্ট্রাইকার এডসন আরান্তেস নাসিমেন্টো।
১০ নাম্বর জার্সি পরিহিত হ্যাংলা শরীর নিয়ে মাঠে নামতে দেখে সেদিন সবাই খানিকটা বিস্মিত হলো। হালকা কুঁজো হয়ে হাঁটা কিশোর নাসিমেন্টো বুটের ফিতা বাঁধতে ভুলে যাওয়া দেখে চারপাশের গ্যালারিতে বিরূপ গুঞ্জন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করে। গ্যালারিকে সমর্থন জানাতে যেন মাঠের ফটোগ্রাফারদের ক্যামেরার শাটার অফ হয়ে গিয়েছিল নিদারুণ অবহেলায়। অসুস্থ শরীর সেই দিন আর সবার অবহেলার জবাব দেয়া হয় নি নাসিমেন্টোর। ম্যাচে সেদিন SANTOS স্ট্রাইকার কোন বিস্ময় উপহার দিতে পারেন নি ঠিকি কিন্তু এরপর থেকে একের পর এক এতো এতো চমক উপহার দিয়েছে যা পুরো ফুটবল ইতিহাস কে বদলে দিয়েছেন তিনি। বলছি পুরো বিশ্বের বিস্ময়কর বালক পেলের কথা।
ফুটবলকে বিউটিফুল গেম নাম দিয়েছিলেন তিনি। যার হাত ধরেই প্রথম সর্বকালের সেরা ফুটবল ধারণার শুরু হয়। পেলের ব্যাপারে আর্জেন্টিনার ১৯৭৮ বিশ্বকাপ জয়ী কোচ মেনোট্টি বলেন যদি ম্যারাডোনা, মেসি, স্তেফানো, ক্রুইফ কে একসাথে করা হয় তাহলে হয়তো পেলেকে পাওয়া যাবে।
ব্রাজিলের ৭০ বিশ্বকাপজয়ী টোস্টাও বলেছেন একি কথা__ রোনালদো আর মেসিকে একত্রিত করলে যে প্লেয়ারটা পাওয়া যাবে সেটা হলো পেলে। অন্যদিকে ক্রুইফ বলেন পেলে একমাত্র খেলোয়াড় যিনি যুক্তির গন্ডি পেরিয়ে গেছেন। তবে পেলে সম্পর্কে সবচেয়ে মুগ্ধকর কথা বলেছেন হাঙ্গেরিয়ান লিজেন্ড, তিনি বলেন সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হচ্ছেন আলফ্রেডো ডি স্টিফানো আমি পেলেকে এই তালিকার বাইরে রাখছি। কারণ তিনি এসবের উর্ধ্বে। কিংবদন্তি এই খেলোয়াড় ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবরে ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের ট্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক বস্তিতে গরীব মা-বাবার পরিবারে জন্মেছিলেন।
কালো মানিক খ্যাত এই শিশুটি কে অভাব-অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছে। রেলস্টেশনে ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি কিছুদিন জুতা পরিষ্কার করার কাজও করতে হয়েছিল থাকে।
বস্তির বন্ধুরা তাকে চিনতেন ডিকো নামে। বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের নামের সাথে মিল রেখে 'এদসোঁ আরাঁচ দু নাসিমেঁতু' মানুষটি ধীরে ধীরে কিভাবে পেলে নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ছিলেন সেটি এই কিংবদন্তি নিজেও জানতেন না। শৈশব কালে সত্ত্যি কারের ফুটবল কেনার কোন টাকা ছিল না তার। মোজার ভেতরে খবরের কাগজ ডুকিয়ে সেটা দিয়ে বানানো ফুটবলের মাধ্যমে শুরু হয় অনুশীলন। পেলে যখন সান্তোসের মূল দলে যোগদান করেন তখন তার বয়স মাত্র ১৬ বছর। সেবার ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবল লিগ সান্তোসের হয়ে লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারটি অর্জন করেন তিনি।
বস্তির সেই ছেলেটিকে নিয়ে ইউরোপের বড় বড় ক্লাবগুলোর মাঝে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। এদের মধ্যে বর্তমান সময়ের জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ ও জুভেন্টাস ফুটবল ক্লাব গুলোই ছিল। সবার একটাই চাওয়া যে কোনো মূল্যে পেলেকে তাদের দলে ভেড়াতে চাই তাঁরা। ব্রাজিলিয়ান লীগে পেলের পারফরম্যান্স এতোটাই নজরকাড়া ছিল যে স্বয়ং সেই দেশের সরকারের চোখ এড়ায়নি। পেলের এই অসাধারণ পারফরম্যান্স তাদের কাছে অমূল্য হিসেবে বিবেচিত হলো। তাই তারা পেলেকে ব্রাজিলের জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এই কারণে অসংখ্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় লীগে পেলের আর কোনদিন খেলা হয়নি।
ফুটবল জগতের বিস্ময় বালক ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিস্ময় দেখাবেন না তা তো হতে পারে না। তাই প্রথম ম্যাচে করেছিলেন বিশ্ব রেকর্ড। ব্রাজিলের হয়ে পেলের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। সময়টা ছিল ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই। সেই ম্যাচে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে গেলেও প্রথম ম্যাচেই বিশ্ব রেকর্ডটি করতে ভুল করেননি পেলে। ১৬ বছর ৯ মাস বয়সে গোল করে অর্জন করেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড।
আরো পড়ুন;
• ১৯৬৬ সালে হারিয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি খুঁজে পেয়েছিল পিকলস নামের একটি কুকুর
• ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে যে দেশ গুলো
• বিশ্বকাপ থেকে ১৭শ কোটি ডলার কিভাবে আয় করল কাতার
১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে পেলের অভিষেক ঘটে। সেই বিশ্বকাপ ফাইনালে জোড়া গোল করে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক বনে যান ১৭ বছর বয়সী পেলে। এভাবে একে একে ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ১৯৭০ এর বিশ্বকাপে খেলেন পেলে। এর মধ্যে তিনবার বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করেন তিনি। ক্যারিয়ারে ১৩৬৩ টি ম্যাচ খেলেন পেলে আর গোল করেন ১২৮৩ টি। ১৯৭৯ সালের নভেম্বরে (VASCO DA GAMA) ফুটবল ক্লাবের বিপক্ষে ব্রাজিলিয়ান লীগের এক ম্যাচে পেলে করেন তার হাজার তম গোল। সেদিন পুরো গ্যালিরি মেতে উঠেছিল উৎসবের বন্যায়। কোন একক খেলোয়াড়ের গোল করার ব্যাপারে এটিই ছিল প্রথম বিশ্বরেকর্ড।
ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার তিনি ফাউলের শিকার হন। সে সময় কার্ড প্রদর্শনের কোন প্রচলন হয়নি বলে অনেকটা অপরিকল্পিত ছিল এসব ফাউল। কিন্তু কোনো বাধাই দমিয়ে রাখতে পারেনি অদম্য এই খেলোয়াড় কে। তার সাক্ষী গোটা বিশ্ব। ১৯৬৬ সালে রোজমেরিকে বিয়ের ১৬ বছর পর তার সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় পেলের। সেই ঘরে এক ছেলে এবং দুই মেয়ে রয়েছেন। এরপর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলিয়ান মডেল মার্সিয়া আওকি সঙ্গে ছুটিয়ে প্রেম করেও দৈনিক শিরোনাম হয়েছেন পেলে। তাকে বিয়ে না করে ১৯৯৪ সালে পেলে নিজের দ্বিতীয় ঘর বাঁধেন আসিরিয়া নাস্কিমেন্টোরং সাথে শেষ পর্যন্ত সেই ঘর টিকিয়ে রাখতে পারেন নি ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তি।
আত্মজীবনী নিয়ে ১৫ কেজি ওজনের একটি বই লিখেছেন পেলে। ফুটবল জীবনের অর্জন মোট ১,২৮৩ টি গোল থেকে নিজের বইটির নাম রেখেছেন ১,২৮৩। ২০১৬ সালে থাকে নিয়ে পেলে: বার্থ অফ এ লিজেন্ড নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক এ আর রহমান এই সিনেমাটির সংগীত পরিচালনা করেন এবং সিনেমায় গাওয়া তার গানটি পুরো বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত হয়। সিনেমাটি শেষ হয় ১৯৫৮ বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার মধ্যে দিয়ে। যেখানে হুইসেল বাজার সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখা যায় আসরের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ফাইনাল ম্যাচ জয়ী সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ প্রোটাগনিস্ট কে।
জিঙ্গেল স্টাইল উন্মাদনায় গ্যালারি যখন উন্মাতাল তখন তার সতীর্থরা ব্যস্ত তরুণ নাসিমেন্টো কে নিয়ে। অসাধারণ এ দৃশ্য দর্শকের মন ছুঁয়ে যায়। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তির জীবনী নিয়ে এটি একমাত্র বাণিজ্যিক ছবি হলেও রুপালি পর্দার সঙ্গে পেলের যোগাযোগটা ছিল বেশ পুরনো। ১৯৬৯ সালে ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশনে ধারাবাহিক ইন্টার ভ্যালু তে প্রথম দেখা গিয়েছিল কালো মানিক কে। অসাধারণ একজন মানুষ হিসেবে পেলের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তাঁর প্রমাণ মেলে সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় লিগে খেলার হাতছানি উপেক্ষা করা। অনেক টাকা আয়ের সম্ভাবনার ঘটেছে অপমৃত্যু। কিন্তু সেসব হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন তিনি। পেলে ভুলে যাননি তার দরিদ্র ভরা শৈশবের কথা। ব্রাজিলের দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করতে খেলোয়াড় থাকা অবস্থাতেই তিনি গড়ে তুলেছেন বিশেষ ফাউন্ডেশন।
আর খেলা ছাড়ার পর কখনো ইউনিসেফের বিশেষ দূত, কখনো জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত, কখনো বা ব্রাজিলের বিশেষ ক্রীড়া মন্ত্রী হিসেবে সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন তাদের সাহায্য করতে। এই কথা বলাই বাহুল্য যে তিনটা বিশ্বকাপ জেতা কোন কাকতালীয় ঘটনা নয় এটি অর্জন করতে তাকে সতের বছর বয়সে যেমন কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে থাকতে হয়েছে তেমনি ৩০ টি বছর শারীরিকভাবে ফিট থেকে ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে জায়গা করে নেয়ার মত ফর্মে থাকতে হয়েছে থাকে। পেলের ৭০ বিশ্বকাপেও সবাইকে ছাপিয়ে ব্যক্তিগতভাবে গোল্ডেন বল নিয়ে বিশ্বকাপ জেতেন।
মাঠের ফুটবলকে চার দশক আগে বিদায় জানালেও কিন্তু ফুটবল তার রাজাকে অবসর দেয়নি। অবসর লাভের পর ও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ফুটবলের সঙ্গে ছিলেন তিনি। এমনকি অসুস্থতার দিনগুলোতেও হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিলিয়ান উত্তরসূরিদের মনে সাহস যুগিয়েছেন তিনি।
0 মন্তব্যসমূহ