Ticker

6/recent/ticker-posts

Header Ads Widget

বাংলাদেশের ডলার সংকট কতটা ভয়াবহ| Bangladesh Economics

Image Source: Unsplash

ঋণপত্র কে বলা হয় লেটার অফ ক্রেডিট সংক্ষেপে এলসি নামে পরিচিত। বৈশ্বিক বাণিজ্যে এলসি বা ঋণপত্র অনেক দরকারি একটি বিষয়। একজন বিদেশী রপ্তানিকারক বাংলাদেশি আমদানিকারকের সম্পর্কে না জেনে বা তার আর্থিক সঙ্গতি সম্পর্কে ধারণা না রেখে মূল্য পরিশোধ করার আগে বিদেশ থেকে পণ্য পাঠাতে চাইবে না।

একইভাবে বাংলাদেশী কোন আমদানিকারক বিদেশী কোন রপ্তানিকারকদের অন্ধ বিশ্বাস করে পণ্য হাতে না পাওয়ার আগেই নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে চাইবে না। এই অবস্থায় ঋণপত্র খুবই কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ঋণ পত্র হলো একজন আমদানিকারকের পক্ষে ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকারনামা বা নিশ্চয়তাপত্র। ঋণপত্রের উল্লেখ থাকে যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালামাল সঠিকভাবে আমদানিকারকের কাছে পৌঁছালে আমদানিকারকের ব্যাংক সরাসরি রপ্তানিকারকের ব্যাংক একাউন্টে তার প্রাপ্য অর্থ পাঠিয়ে দিবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধের যত গুলো পদ্ধতি আছে এলসি এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। এলসি বিশ্বব্যাপী নিরাপদ সর্বজনগ্রাহ্য অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। 


বাংলাদেশে রেমিটেন্স এবং রপ্তানি খাত থেকে যে পরিমাণ ডলার আয় করছে দেশের আমদানি ব্যয় এবং গ্রাহকদের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে তার চেয়ে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন পড়ছে। সেজন্য খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি খোলা বর্তমানে প্রায় বন্ধ রয়েছে। যে কয়েকটি ব্যাংকের কাছে এখনো ডলার জমা আছে সেগুলো কমে আসছে ধীরে ধীরে। আর এই সংকটের কারণে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজার। এই অবস্থায় এলসির নিশ্চয়তা দেয়া বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছে বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

বাংলাদেশের পণ্যের মূল্য পরিশোধের বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছেনা তাই বিদেশী অনেক ব্যাংক এখন বাংলাদেশে নিজেদের ক্রেডিট লাইন কমিয়ে দিতে শুরু করেছে। পরিচয় গোপন রেখে একাধিক ব্যাংকের প্রধান জানিয়েছেন বিদ্যমান ডলার সংকট পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ কিন্তু নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতির কথা বুঝতে পারছেন না। প্রতিদিনই কোন না কোন ব্যাংকে এলসি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে। সেই সাথে ব্যাংকগুলোর ডলার ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স প্রবাহ যে হারে কমছে তাতে আশঙ্কা করা হচ্ছে ডলার সংকট আরো তীব্র হবে।

ব্যাংকগুলো এলসি দায় পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বিদেশি ব্যাংকগুলো বাংলাদেশের এলসি নেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে। সংকট সমাধানের বিকল্প চেষ্টা করা হলেও তাতে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

সম্প্রতি চীনা মুদ্রায় এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া হলেও ব্যাংক এবং গ্রাহক কারো পক্ষ থেকেই তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি এজন্য বাধ্য হয়ে দেশের আমদানি কমানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এলসি খোলার হার কমলেও দায় পরিশোধের হার অনেক বেড়েছে। কারণ এলসি খোলার সঙ্গে সঙ্গে কোনো পণ্য আমদানি হয় না বেশির ভাগ দেনা পরিশোধ হয় পণ্য দেশে আসার পর। কয়েক মাস আগে যে সমস্ত পণ্য আমদানি করা হয়েছিল সেসব এর মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে এখন। বর্তমানে গাড়ি, টিভি, ফ্রিজ এবং ফলের মতো পণ্য আমদানিতে অনেকক্ষেত্রেই অনুমতি দিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কারণ এই সব পণ্যের এলসি খোলার খুব কম সময়ের মধ্যেই পণ্য দেশে চলে আসে। তাই এগুলোর মূল্য খুব তাড়াতাড়ি পরিশোধ করতে হয়। 

আরো পড়ুন;

• আইএমএফের ঋণ বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ? IMF LOAN


• রাতারাতি দেউলিয়া ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা স্যাম ব্যানকম্যান-ফ্রাইড


• পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার শীর্ষে এখন বাংলাদেশ


বাংলাদেশের ডলার সংকটের ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অগ্রণী ব্যাংকে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গুলোর কাছে কোন নগদ অর্থ তো নেই। সেই সাথে ২৫৬ মিলিয়ন ডলারে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গ্রাহকদের হিসেবে থাকা ডলার ভাঙিয়ে এইসব ঘাটতি মেটানো হচ্ছে। তার মানে বিপদে পড়ে ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষের ডলার খরচ করতে শুরু করেছে। গ্রাহক আমানতের ডলার ফেরত চাইলে দিতে পারবে না। একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার কারণে সোনালি, রুপালি, ও জনতা ব্যাংকের অনেক এলসি দায় পরিশোধে বিলম্ব করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ব্যাংক রয়েছে ব্যর্থ হওয়ার তালিকায়।


অনেক বেসরকারী ব্যাংকও ঘাটতি মেটাতে গ্রাহকের ডলার ভাঙতে শুরু করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো দেশের সর্ববৃহৎ ব্যাংক নির্ধারিত সময়ে এলসি দায় পরিশোধ করতে পারেনি। দেশের মোট রেমিটেন্স প্রবাহের প্রায় ৩০ শতাংশই আসে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে। আবার রপ্তানি আয়ের দিক থেকেও ব্যাংকেটির অবস্থান সবার শীর্ষে। তারপরও আমদানি দায় পরিশোধ নিয়ে বিপদে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এই ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয় দেশের কোন ব্যাংক চাহিদা অনুযায়ী ডলার পাচ্ছে না। এ কারণে মূলত সব ব্যাংকেই কম বেশি সংকট আছে। ডলার সংকটের কারণে বর্তমানে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক গুলো ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণপত্র খুলতে পারছে না। শুধু তাই নয় অতীতে বহু ঋণপত্রের দায় পরিশোধ করতে গিয়ে ও হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠিত অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক। এমনকি বহু ব্যাংকের মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। যার ফলে অনেকেই বাইরে থেকে কাঁচামাল আমদানি করতে পারছেন না।

যার প্রভাবে স্থানীয় শিল্প বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আগে যেখানে পণ্য আসার পর টাকা প্রদান করা হতো আর এখন কোন পণ্য আসার দুই থেকে তিন মাস আগে টাকা অগ্ৰিম দিয়ে দিতে হচ্ছে। এর ফলে বড় ব্যবসায়ীরা দু-একটি এলসি খুলতে পারলে ও মাঝারি এবং ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের ব্যবসা প্রায় বন্ধ হবার পথে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী দেশের ব্যাংক গুলো নিজেদের মূলধনের ১৫ শতাংশ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণ করতে পারে। কিন্তু অনেক ব্যাংকের সংরক্ষণের সীমা পরিমাণ ডলার তো দূরের কথা উল্টো কয়েক মিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন কোন ব্যাংকের ডলার ঘাটতি অনুমোদিত সীমার বেশি হয়ে গেলে ওই ব্যাংক খেলাপি হতে বাধ্য।

সে হিসেবে বাংলাদেশের বহু ব্যাংক এই ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাফেদা বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে বৈঠকে বসে দাবি জানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সহায়তা দেওয়া না হলে দেশের অনেক ব্যাংক এলসি দায় পরিশোধ করতে পারবে না। রিজার্ভ থেকে ডলার দেয়া না হলেও অন্তত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার সরবরাহ করার সুযোগ দেয় তারা। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক এসব দাবি নাকচ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ডলারের বাজার স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এরি মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যাংক গুলোর এলসি খোলাল পরিমাণ প্রায় প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি দল ব্যাংকের খোলা এলসি গুলো পর্যবেক্ষণ করছে। কারণ এসব এলসি বা ঋণ পত্রের মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাচার হওয়ার একটা বড় সুযোগ থেকে যায়। অনেক ব্যবসায়ী তাদের আমদানি পণ্যের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশী দামে দেখিয়ে এলসি খোলে থাকেন। এই অতিরিক্ত অর্থ সহজেই সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এরকম ভাবে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে বহু অসাধু লোক বিদেশে দামি বাড়ি গাড়িসহ বিলাসী জীবন যাপন করছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায় বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজরা দেশের অর্থ পাচার করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। দেশের টাকা পাচারের কথা মাথায় আসলো কানাডার বেগম পাড়ার নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। সাধারণত অর্থ পাচার কারি ও দুর্নীতিবাজদের অনেকেই দেশে থাকলেও তাদের স্ত্রী সন্তানরা থাকেন কানাডায়। অসাধু লোকদের বেগমরা যেখানে থাকেন সেটার নাম রাখা হয়েছে বেগম পাড়া।

إرسال تعليق

0 تعليقات