![]() |
| ফুটবলের রাজপুত্র নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র; Image Source: Twitter |
২০০৪ সালের দিকে ব্রাজিলের সান্তোসে ছোট এক জাদুকরি বালকের সন্ধান পেল সাংবাদিকেরা। ইন্টারভিউতে বালক টিকে জিজ্ঞেস করা হলো এই বয়সে এত গুলো পুরস্কার পেয়েছ প্রথম প্রাইজমানি দিয়ে তুমি কি করবে? ছেলেটির সহজ সরল উত্তর আমার পরিবারের জন্য খরচ করব। বাবা মাকে দেব। সাংবাদিক পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন:- নিজের জন্য কিছু কিনবে না? লজ্জায় মুচকি হেসে দিয়ে বললো জানিনা। ব্রাজিলের একদম সাধারন একটি ঘর থেকে উঠে আসা ছেলেটিকেই এখন ফুটবলের রাজপুত্র বলা হয়। কিভাবে ব্রাজিলের সাও পাওলোর সেই ছোট্ট শিশুটি আজকের বিখ্যাত ফুটবলার হলেন? সেই সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করবো আজকের এই ব্লগে।
নেইমারের জন্ম ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে। তার পুরো নাম নেইমার দা সিলভা সান্তোস জুনিয়র। তার বাবার নাম নেইমার সান্তস সিনিয়র। তিনি ছেলেকে আদর করে জুনিয়র বলে ডাকেন।
বাবা নিজেই ছিলেন একজন ফুটবলার কিন্তু তিনি সেইভাবে বড় কিছু করতে পারেন নি। স্বপ্ন দেখতেন ছেলেকে দিয়ে পূরণ করাবেন ব্রাজিলের জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন। অবশেষে যে চিন্তা সেই কাজ বড় করে তুললেন সেভাবেই। শিশু নেইমার হাঁটা শেখার আগেই ফুটবলে লাথি মারা শিখে গেলেন। আরেকটু বড় হলে তাঁর বাবা তাকে নিয়ে যান খেলার মাঠে। মাঠ টা ছিল ইন্ডোর স্টেডিয়াম সেখানে চমৎকার খেলে নেইমার সবার নজরে আসেন। সবাইকে পাশ কাটিয়ে বল পায়ে জাদুকরী দক্ষতায় মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন দর্শকদের।
স্বপ্নপূরণের পথে প্রথম সাফল্য আসে যখন মাত্র ১১ বছর বয়সে ব্রাজিলের শীর্ষস্থানীয় ক্লাব সান্তোস যুব দলে খেলার সুযোগ পান তিনি।
২০০৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের সূচনা ঘটে তার। সেই বছরেই সেরা খেলোয়াড় হিসেবে অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন তিনি। ২০১০ সালে ধূমকেতুর মতো উত্থান ঘটে নেইমারের। সান্তোসি লিগ চ্যাম্পিয়নশীপ,কোপা দ্যা ব্রাজিল চ্যাম্পিয়নশীপ জেতা ছাড়াও টানা চার বার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন তিনি। ২০১১ সালে সান্তোসকে ৪৮ বছরের ভেতর প্রথমবারের মতো কোপা চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পথে নেইমার এমন একটি অসাধারণ গোল করেন যেটি ফিফার বর্ষসেরা ফুটবলারের গোল হিসেবে মনোনীত করা হয়। এছাড়াও সেরা খেলোয়াড়ের দৌড়ে শুধু ব্রাজিলে নই দক্ষিণ আমেরিকার সেরা এওয়ার্ড ও জিতে নেন নেইমার।
মজার ব্যাপার হলো নেইমারের গতিপথ একদমই ভিন্ন হতে পারতো কারণ তার বয়স যখন মাত্র ১৪ বছর তখন খোদ রিয়েল মাদ্রিদ থেকে তার জন্য মোটা অংকের বেতনে প্রস্তাব আসে। কিন্তু সান্তোস তাদের এই অসামান্য প্রতিভাধর খেলোয়াড়টিকে হাতছাড়া করতে রাজি ছিল না। তাই তারা রিয়েল মাদ্রিদ এর চেয়েও বেশি বেতন দিয়ে নেইমারকে রেখে দেয় নিজেদের কাছে। এই বিশেষ প্রতিদানে নেইমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য উপহার দিয়েছে সান্তোসকে। কিন্তু সান্তোস আর কতদিন নেইমারের মতো এত বড় মাপের আন্তর্জাতিক মানের তারকাকে নিজেদের কাছে ধরে রাখতে পারেন। সেটা শান্তোসের বুঝতে আর বাকী রইল না। ২০১৩ সালে নেইমার পাড়ি জমান বার্সেলোনায় তার নতুন ঠিকানায়। তখন সেখানে কাজ করছেন মেসি সুয়ারেজের মত কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের সাথে। তাদের সাথেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমানে সমান দক্ষতা প্রমাণ করে গেলেন বয়সে নবীন নেইমার।
তিনজনে মিলে বার্সেলোনাকে জেতালেন অনেক অনেক ট্রফি ২০১৪-১৫ মৌসুমে অসাধারণ নৈপুণ্য ৩৯ গোল করে বার্সেলোনাকে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ট্রেবল জেতায় মুখ্য ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০১৭ সালে তিনি বার্সেলোনা ছেড়ে পিএইচডিতে যোগ দেন ২২২ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। রেকর্ড গড়েন পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফুটবলার হিসেবে।
আরো পড়ুন;
• কাতার বিশ্বকাপের প্রাইজমানি ভাঙ্গলো অতীতের সব রেকর্ড
• ক্লিনার থেকে সবচেয়ে দামী ফুটবল কোচ
• ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা প্লেয়ার
এত বিখ্যাত সফল এবং ধনী হওয়ার পরও নেইমার নিজেকে একদমই বদলান নি। এক দিন ছোট বেলায় কোন এক ইন্টারভিউতে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তুমি কেন ফুটবলার হতে চাও তিনি জবাব দিয়েছিলেন যেন আমি আমার পরিবারের যত্ন নিতে পারি টাকা-পয়সা নিয়ে যেন আমার মা-বাবাকে কোনোদিন ভাবতে না হয়। নেইমার সত্যি তার কথাটা রেখেছেন। অনেক খেলোয়াড় আছেন যারা একটু খ্যাতি ও অর্থ বিত্ত পেলে মাথা ঘুরে যায়। ধরাকে সরা জ্ঞান বলতে শুরু করে। কিন্তু নেইমার এখনো তার পরিবারকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন। এখনো নেইমারের বাবা সব সময় তার পাশে থাকেন। তার টাকা পয়সার হিসেব-নিকেশ থেকে শুরু করে সবকিছু দেখভাল করেন তার বাবা। মায়ের জন্য নেইমারের ভালোবাসার কোন তুলনা নেই। মাকে কাছে পেলে সব কষ্ট ভুলে যান তিনি। এভাবেই পরিবারকে পাশে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নেইমারের জয়যাত্রা।
শুধু ক্লাবে নয়, ব্রাজিলের জাতীয় দলের তিনি একজন দারুণ সফল খেলোয়াড়। ২০১০ সালে ব্রাজিল দলে তার খেলার কথা ছিল কিন্তু তৎকালীন ব্রাজিলিয়ান কোচ দুঙ্গা তাকে দলে রাখেন নি। পেলে, রোনালদো সবাই কোচ কে অনুরোধ করেন এবং হাজার হাজার ভক্ত পিটিশন করে নেইমারকে দলে নিতে কিন্তু দুঙ্গা সেটা কোন ভাবেই আমলে নিলেন না। তিনি বললেন নেইমার এখনো অপরিণত। তাকে দিয়ে দলে খেলানো সম্ভব নয়। আর এখন সেই অপরিণত ও অবহেলিত নেইমার এখন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে ও রোনালদিনহোর পরেই ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নাম লিখিয়েছেন তিনি। সুতরাং তিনি যেভাবে খেলে যাচ্ছেন ভবিষ্যত এক নম্বর আসনটি দখল করে নিতে পারেন নেইমার । এই বিশ্বকাপে নেইমার তার জাদুকরি ফুটবল দক্ষতায় ব্রাজিলের স্বপ্ন পূরণ করবেন এমনটাই প্রত্যাশা ভক্তদের।
নেইমার সম্পর্কে মজার কিছু তথ্য জানা যাক
ব্রাজিলের ইতিহাসে পেলে, রোনালদো,কাকা ও রোনালদিনহো থেকে শুরু করে কিংবদন্তি ফুটবলারের অভাব নেই। কিন্তু নেইমারই একমাত্র ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার যিনি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে স্থান পাওয়ার অনন্য সম্মান অর্জন করেছেন।
নেইমার মাত্র ১৯ বছর বয়সে একমাত্র বাবা হন।
তিনি বলেন__ "আমি তো প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম এতো কম বয়সে এতো বড় দায়িত্ব কিভাবে নেব" । কিন্তু এখন আমার সন্তানের হাসিমুখটা আমার কাছে সবকিছু। নেইমারের ক্যারিয়ারে অত্যন্ত কাকতালীয় একটি ব্যাপার আছে। যেদিন তার ২০ তম জন্মদিন ছিল ঠিক সেদিনই তিনি পেশাদার ক্যারিয়ারে শততম গোল পূর্ণ করেন। এমন ইতিহাস হয়তো আর কখনো ঘটেনি।
নেইমার ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন এ ব্যাপারে তিনি আদর্শ মানেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি কাকা কে। তিনি নেইমারের বড় ভাইয়ের মতো। কাকার আদর্শ মেনে নেইমার সবসময় তার মোট আয়ের দশ ভাগ অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে থাকেন। তাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে মার্কেটেবল খেলোয়ার। কেবল নেইমারের ছবি দিলেই যে কোন পণ্যে হুঁ হুঁ করে বিক্রি বেড়ে যায়। বিজ্ঞাপনের বাজারে নেইমারের সাফল্য এত বেশি যে তাকে নিয়ে একটি শব্দ তৈরি হয়েছে নেই মার্কেটিং। নেইমার ভীষণ মাতৃভক্ত মায়ের জন্য সবকিছু ছাড়তে পারেন তিনি। পরিবারের প্রতি ভালোবাসার জন্য তিনি সবার কাছে প্রশংসিত। নেইমার কে বিভিন্ন সময় আলোচনা ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। কিন্তু সেগুলো তাকে কখনো দমিয়ে রাখতে পারেনি। খেলার ফলাফল দেখলে বোঝা যায় কে সফল আর কে ব্যর্থ। তাই নেইমার বলেন সাফল্য পেতে চাইলে সমালোচনাকে ভয় করলে চলবে না। তোমার কাজ বিজয় ছিনিয়ে আনা। কে কি বলল সেটা শোনার কোনো মানে হয় না। দিন শেষে স্কোরবোর্ডে বলবে কে আসল বিজয়ী।

0 تعليقات